রবিবার, ১৭ মার্চ, ২০২৪

রবিবারের গল্প। মানুষ খোঁজার গল্প।

টান

রবিবারের গল্প। মানুষ খোঁজার গল্প।



                  রবিবার সকাল সাড়ে সাতটা। বহুতলের সিক্স ফ্লোরের ২৭ এ, থ্রি বিএইচকেতে বেজে উঠল "গুলাবি সারারা..." কলিংবেল। যদিও এসময়, এই বাসায় সাত সকাল । 

           কলিংবেলর বেলের শব্দে একরাশ বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলল আবরণ দেবনাথ। রুম ওনার।  রবিবার সকাল প্রায় দশটা পর্যন্ত তার ঘুম চাই। সপ্তাহ জুড়ে ক্লাইন্ট সার্ভিস দিতে দিতে মটকা গরম থাকে। তাই ছুটির দিনগুলোর সকালে রাতের মতো ঘুমিয়ে কাটায়।

           পাশের রুমে নাইন ও ফাইভে পড়া ছেলেমেয়ে ঘুমাচ্ছে। ওরা সাড়ে নটার কাছাকাছি উঠবে। তারপর পাঁচ সাত মিনিটে রেডি হয়ে কোচিং ও টিউটোরিয়ালে পৌঁছাবে। দেরিতে উঠে পাঁচ মিনিটে ম্যাগির মত রেডি হওয়ার মহাজাগতিক কায়দা ওরা শিখে ফেলেছে। ওদের জন্য বছরে কয়েকবার কলিংবেলের মিউজিক পাল্টাতে হয়। যখন যে গান ভাইরাল হয়, সেটাই কলিংবেলে লাগাতেই হবে; মাস্ট। 

           আবরণ আড়মোড়া ভেঙে ওঠে। পাশে মিসেস শর্মিতা মুখ আলো করে মোবাইলে রিলস দেখছেন। এই বসন্তে কোকিলের ডাকের মতো রিলসের সাউন্ড শোনা যাচ্ছে।  

             সে  দরজার দিকে এগিয়ে যায়। এত সকালে কে এলো! বছর পনেরো এই ফ্ল্যাটে আছে, রবিবার সকালে কেউ তাকে ডিস্টার্ব করেনি কখনো। সে এত বিরক্ত যে আইহোলে চোখ না রেখে সরাসরি দরজা খুললো। শুনিয়ে দেবে দু - চার কথা।  

         খুলতেই দেখল, ফিফ্‌থ ফ্লোরের মাসীমা জড়োসড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আবরণের ঢুলুঢুলু চোখে হাজার চিন্তাভাবনার ফ্লাশব্যাক।

        এখানকার অনেক পুরানো বাসিন্দা মাসিমা। সরাসরি কথা হয়নি কোনদিন। এত বছরে অনেকবার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু চোখ সরিয়ে চলে যাওয়া যায় এমন সম্পর্ক, দুজনের তরফ থেকেই।

       মাসিমা বয়স আশি ছাড়িয়েছে। একটু খুঁড়িয়ে চলেন। দুই ছেলেমেয়ে বিদেশে। তারা দেশে ফেরে না বললেই চলে। কাজের মেয়ে বিএ পাশ বিভা আছে। ও দেখাশোনা করে।

      বিভা চলন্ত ইউটিউব চ্যানেল। সব সময় টকবগিয়ে মুখ চলে। দেখা হলেই,  'স্যার, জব টব থাকলে বলবেন সিভি পাঠিয়ে দেব। মাসিমার দেওয়া স্যালারিতে লিমিটেশনে চলছে।' খুব হাসিখুশী আর মিশুকে ধরনের।
       
          "সকাল সকাল মনে হয় বিরক্ত করলাম" বলে, মাসিমা যেন আঁচলে চোখ মুছলেন। "সব বিক্রি করে আজ এখান থেকে চলে যাচ্ছি। মেয়ে ইভা জার্মানি সেটেল্ড করেছে। শেষ জীবনটা ওখানেই কাটবে; মনে হয়। তোমাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে লিফটে, ফ্লোরে দেখা হতো। কথা বলি বলি করে বলতে পারিনি। তোমরা সবাই ব্যস্ত মানুষ। কথা বললে কি ভাববে, তাই বলিনি।
হাতে বানানো গাজরের মিষ্টি রাখো। খেয়ো সবাই মিলে।
আসি বাবা, তোমরা ভালো থেকো।"    

            আবরণ খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে, মাসিমা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে লিফটের ভিতর ঢুকছেন। সে বুঝতে পারে না যে তার সকালের ঘুম উবে গেল কিনা!

           এখান থেকে মাঝেমধ্যেই কোনো না কোনো ফ্যামিলি চলে যায়। কোনো খবর হয় না। কেবল
সিকিউরিটি সৌরভের কাছ থেকে জানা যায়। খুব ভালো ছেলে সৌরভ। দীর্ঘ দিন বেকার থাকার পর এই বছর আঠাশে এসে সিকিউরিটির জব নিয়েছে এবং ইগনু থেকে এম‌এসসি করছে।  আবরণ ছেলেমেয়ের টুকিটাকি জটিল ম্যাথ ওর কাছ থেকে সলভ করে নেয়। বিনিময়ে কিছু দিলে, বিনয়ী সৌরভ নিতে চায় না। হেসে বলে, 'ম্যাথস আমার ভালোবাসার সাবজেক্ট'। আবরণ‌ও হেসে চোখে মুখে বিশেষ ইঙ্গিত করে বলে, 'আর বিভা'?
মজার ছলে লজ্জিত গলায় সৌরভ উত্তর দেয়, 'ইউটিউবার'। দুজনেই নীচু শব্দে হাসে।


                বিছানায় আসতেই শর্মিতা মোবাইলের দিকে চোখ রেখেই প্রশ্ন করলো, "কে এসেছিল?" 
আবরণ যান্ত্রিকভাবে উত্তর দেয়। 'ফিফ্‌থ ফ্লোরের মাসিমা।'
             –"উনি তো কখনো কথা বলেন না। আজ কী বললেন?"
            –"এই ফ্ল্যাট বিক্রি করে বিদেশে মেয়ের কাছে চলে যাচ্ছেন।"
           –"তাতে আমাদের কী!"
           –"সেটাই। আমরা এখানে এতো বছর আছি। কিন্তু এখানকার হাউসিং রেসিডেন্টরা কেউ কারো পরিবারের অংশীদার বা আত্মীয়  হয়ে উঠতে পারিনি। যে যার দরজা বন্ধ করে চারকোনা চৌবাচ্চার মানুষ হয়ে থাকলাম।" 

              আবরণ মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়। ফেসবুক ওয়ালে লেখে "আকাশদীপ অ্যাপার্টমেন্ট ফিফ্থ ফ্লোরের মাসিমা,  আপনি এখানে অনেক বছর ছিলেন। এখন চলে যাচ্ছেন। কিছু মায়া হয়তো ফেলে যাচ্ছেন।  আপনার চোখের জলে  সেই মায়া দেখেছি।  কখনো এদেশে এলে আমার ফ্ল্যাটে উঠবেন আসবেন। কোনো দ্বিধা করবেন না।" 
                লেখাটা পাবলিশ করে, আবার শুয়ে পড়ে। যদিও জানে এখন ঘুম আর আসবে না। 
                 
               প্রায় বছর দুই পরে পোস্টটি জার্মানির ইভানার চোখে পড়ে । স্যাড রিয়াক্ট দেয় এবং কমেন্ট করে, "মা গত বছর মারা গেছেন। আমি সামনের সামারে অফিসিয়াল দরকারে ইন্ডিয়া যাবো। আপনার কাছে উঠবো। কদিন থাকবো।  ওখানে আপনারা ছাড়া আমার আপন বলতে কেউ নেই।"
  ____________________________________

লেখাটি পড়ার জন্য অনেক শুভেচ্ছা ধন্যবাদ। সাথে থাকুন। পাশে থাকুন । ব্লগটিকে ফলো করুন। শেয়ার করুন। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন