রবিবার, ২৪ মার্চ, ২০২৪

মোবাইল থেকে দূরে রাখার টেকনিক। বসন্ত দিনের গল্প। দোল উৎসব।

মোবাইল থেকে দূরে রাখার টেকনিক। বসন্ত দিনের গল্প। দোল উৎসব।



লাল আবির 


          "হ্যালো সূর্যেন্দু, এখুনি জোড়া বটতলায় চলে আয়।" বলেই; ফোন কল কেটে দেয় রিয়ানি।

         দ্রুত পোশাক পরতে থাকে সূর্যেন্দু। আমাদের চারপাশের পরিচিত জনের মধ্যে কিছু কিছু মানুষকে আমরা চরম গুরুত্ব দিই। তার কাছাকাছি থাকতে ভালো লাগে। তার ফোন কলের আশায় উন্মুখ হয়ে থাকি। সূর্যেন্দুর কাছে এমনই একজন রিয়ানি। শুধু কী মানুষ! কিছু জিনিসকে কাছে টানি। কিছু দূরে ঠেলি। যেমন মোবাইলকে কাছে টেনেছি। বইকে ঠেলেছি দূরে। সূর্যেন্দুর নাম এই তালিকায় অনেক উপরে রাখা যায়। সে পরিবারের আপন জনেদের চেয়ে রিয়ানি প্রায়োরিটি দিয়েছে। একই ভাবে মোবাইলকে জাপটে ধরে পড়াশোনাকে অবহেলা করেছে।

               পোশাক পরতে পরতে ভাবতে থাকে, 'কী হলো রিয়ানির। এমন আর্জেন্ট! কিন্তু কোনো কথা বলতে না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল।' ১৩ই ফেব্রুয়ারি রিয়ানিকে কল করেছিল। "হ্যালো, প্লিজ টেক অ্যা সিট। বিকজ, ইউ ফেইল ডাউন হেয়ারিং দিস লাভিং ওয়ার্ড... আই আই আই লাভ ইউ।" অনেক দিনের বান্ধবীকে রোজ বলি বলি করে প্রপোজটা করা হচ্ছিল না। সব কাজে তার বড়ো দেরি হয়ে যায়। অযথা আলসেমি। এই জন্য প্রপোজ করাটাও হচ্ছিল না। আজ বলতে পেরে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। আগামীকাল স্পেশাল ডে ১৪ই ফেব্রুয়ারি। কিন্তু, মোবাইলের ওপাশ থেকে সাড়া নেই কেন!

            "রিয়ানি... রিয়ানি আর ইউ হেয়ার মি।" প্রেমের উত্তাপে জড়িয়ে গড়িয়ে ইংলিশ বলছিল। ফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। রিং করলে টু টু শব্দ হচ্ছে। ওর প্রপোজ শুনে হয়তো রিয়ানি বিরক্ত হয়ে কল কেটে দিয়েছে। হায় হায়, এখন ওকে মুখ দেখাব কী করে!

       মা তখন ঘরে ঢুকে ড্রয়ার থেকে প্রেসারের ওষুধ নিচ্ছিল। ছেলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল, 'তিনি যেন সুজার মুখে ওর অপছন্দের নিম বেগুন ঠুসে দিয়েছেন'। সূর্যেন্দুর ছোট ভাইয়ের বার্থডে কয়েকদিন পর। সে এসেছিল দাদার সঙ্গে বার্থডে সেলিব্রেটের প্ল্যান নিয়ে কথা বলতে। কিন্তু দাদাকে দেখে সুবিধা মনে হয়নি। 'দাদা যেন একটা বড়ো বার্থডে বেলুন। তবে কোথায় একটা ছিদ্র আছে। সেখান দিয়ে ধীরে ধীরে বাতাস বেরিয়ে চুপসে যাচ্ছে।'

          "কি রে সুজা, দু-দিন পর যে উচ্চ মাধ্যমিক, পড়ছিস টড়ছিস? না ওই মোবাইল আর টোটো কোম্পানি! ভালো নম্বর না পেলে সোজা বোম্বের বিস্কুট কোম্পানি... মনে থাকে যেন।" বাবা এসব কথা ছুঁড়ে দিয়ে বুঝতে পেরেছিল, ছেলে পরীক্ষায় বসার আগেই ফেল করে ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

        সেই রিয়ানি ফোনে এত তাড়া দিল। মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। দেখা করার জন্য; সাইকেলে হয়ে উঠেছিল রয়েল এনফিল্ড। পৌঁছালো জোড়া বটতলায়। যেখানে রাস্তার দু-পাশের বেশ বড়ো দুটি বটগাছ। রাস্তার দশ-পনেরো ফুট উপরে একে অন্যের ভিতর ডালপালা চালিয়ে দিয়ে মিলেমিশে একাকার। দুই গাছের ঝুরি মাটির দিকে নেমে এসেছে।

        রিয়ানি আর ওর বোন শ্রেয়সী বসেছিল বাম পাশে রাঙা ফলে ভরা বট তলায়। সূর্যেন্দুকে দেখে হাসিমুখে উঠে আসে রিয়নি। "আমার ফোনটা খারাপ হয়ে গেছিল। আজ বাবা রিপেয়ার করে এনে দিয়েছে। তুই সেদিন কী বলছিলি শুনতে পাইনি। তবে তোর গলা বেশ উত্তেজিত লাগছিল। আর ওই জন্যই বোধহয় আমার ফোনটা খারাপ হয়েছিল।" রিয়ানি নিঃশব্দে হাসে। বুকে সাহস ফিরে আসে সূর্যেন্দুর। 'যাক বাবা, ওর ভুল ভাল ইংরেজির প্রপোজ রিয়ানি শুনতে পায়নি।'

       শ্রেয়সী একটু দূরে দাঁড়িয়ে বটের টকটকে লাল ফল খেতে আসা পাখিদের ছবি তুলছে। রিয়ানি ব্যাগ থেকে লাল আবিরের প্যাকেট বের করে সূর্যেন্দুর কপালে ছোট্ট তিলক আঁকে এবং আলতো করে দু-গালে লাগায়। "আবিরটা ফুলের পাপড়ি থেকে বানিয়েছি। প্যাকেটটা নে। কদিন পরে দোল, বাড়ির বড়োদের পায়ে দিস। ছোটদের কপালে গালে লাগাস। আর এই কাগজটা ধর। এতে তোর পড়ার রুটিন আছে। কয়েক ঘন্টা করে সব সাবজেক্ট প্রতিদিন পড়বি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা এখনও দিন কুড়ি বাকি। এটা ফলো কর। যা ফাঁকি মেরেছিস, কিছুটা রিকভার হতে পারে। তবে শর্ত, মোবাইলটা আমাকে দিতে হবে। ফেরত পাবি সেই পরীক্ষার পর।"

        ফ্যালফেলে ক্যাবলা হয়ে যায় সূর্যেন্দু। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মোবাইলটা রিয়ানির হাতে দিয়ে দেয়। "গুড বয়। পরীক্ষার পরে ঠিক এখানে দেখা হবে।" রিয়ানির কথা শেষ হতে না হতেই। একদল বাঁদর এসে বটের ডালে ডালে উদ্দাম খেলায় মেতে ওঠে। বটের লাল লাল ফল ঝরতে থাকে রিয়ানি ও সূর্যেন্দুর মাথায় এবং চারপাশে। ওদের দিকে মোবাইল তাক করে ছবি তোলে শ্রেয়সী। ছবিতে দুজনের চারিদিকে লাল লাল বাবেল।

         ওরা চলে যাচ্ছে যে যার বাড়িতে। পিছন থেকে তাড়া করে যাচ্ছে কোকিলের মিষ্টি কহুতান। অনেক বছর পর প্রতিষ্ঠিত সূর্যেন্দু প্রশ্ন করেছিল। "আবিরে কী মিশিয়ে ছিলে? যাতে আমার সব গড়িমসি উধাও করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখালে?"

           শিক্ষা সংক্রান্ত আর্টিকেল লিখতে লিখতে চোখের চশমা খুলে নরম স্বচ্ছ আপন দৃষ্টি রেখে রিয়ানি বলে, "আমার রক্ত আর বসন্ত"।

______________(প্রকাশিত গল্প)______________

লেখাটি পড়ার জন্য অনেক শুভেচ্ছা ধন্যবাদ। সাথে থাকুন। পাশে থাকুন । ব্লগটিকে ফলো করুন। শেয়ার করুন। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন