মাবেলা
উৎপল মণ্ডল
তখন চার-সাড়ে চার বছর বয়স। পাড়ার এবাড়ি ওবাড়ি খেলে বেড়িয়ে সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে দেখি মা নেই। সারাদিন যাই করি না কেন, সন্ধ্যায় মাকে চাই চাই চাই। ছুটে রাস্তায় গিয়ে দেখি সাধারণ শাড়ি পরা মা, আমাদের বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। তবে কি মামার বাড়ি যাচ্ছে মা! আবছা অন্ধকারে মায়ের পিছু পিছু কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াচ্ছি....পড়ে যাচ্ছি... উঠছি.... আবার দৌড়াচ্ছি।
পাঁচ-সাত মিনিট গিয়ে ভুল ভাঙলো। অন্য পাড়ার কাকিমা; মায়ের মতোই শাড়ি পরা বলে চিনতে পারিনি।
কাকিমা বলে - মিলু! ভর সুনধেব্যালা কোনে যাচ্চি?
যতদূর এসেছি, এখান থেকে বাড়ি ফেরার মানে হয় না। আরেকটু গেলে মামার বাড়ি। গেলাম। প্রথমে ছোটমাসির সঙ্গে দেখা হলো। মাসি আমার হাত ধরে কাঠের দোতলা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলে, - এ্যই গাঘোর অন্দোকারে অ্যাকলা কি কুরে আইলি? তোর ভয় করে না!
আমি জানি ছোটোমাসীর সারা শরীরে মায়ের ছায়া মাখা। সে মাসি একদিন অসুস্থ হয়ে মারা গেল। রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম, বড় সাদা কাপড়ের থান থেকে একজন কাঁচি দিয়ে এক টুকরো সাদা কাপড় কেটে আলাদা করে দিল। খুব ধাক্কা লেগেছিল। মায়ের মত... মায়ার মতো... শিকড়ের মতো নাড়ী কোথায় কোনখানে জড়িয়ে থাকে কে জানে! কাঁচি বা কোনো কিছু দিয়ে যে দিক থেকেই কাটো না কেন লাগবেই।
আমি কলেজ ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি।তখন ক্যানিংয়ের মাতলা নদী ভাটার সময় পায়ে হেঁটে হয়ে পার হওয়া যেত। মাঝবয়সী মহিলা এসে বললেন, - বাবা নদীর মাঝখানে অল্প জলে কারেন্টের মতো স্রোত বয়ে যাচ্ছে, হাঁটতে গেলে পায়ের তলা থেকে বালিমাটি সরে যায়, তোমার হাতটা একটু ধরে পার হবো.... বাবা....।
নদীর ওপারে যেতেই কত কত আশীর্বাদ করলেন। তোমার খুব ভালো হোক বাবা...... তুমি অনেক বড় মানুষ হবে..... বাবা, চির সুখী হও.....
আমি ভাবতে পারছি না। আমার মত দুর্বল শরীরের, দুর্বল চরিত্রের মানুষের হাতকে কেউ স্রোতের নদী পার হওয়ার জন্য বিশ্বাস আস্থা রাখতে পারেন! উনি নিশ্চয়ই আমার মা। তাকিয়ে দেখি সত্যিই তো, উনার হাঁটার ধরণ.... সাদামাটা শাড়ির রঙটা..... এমনকি পাটের হ্যান্ড ব্যাগটাও নিখুঁতভাবে মায়ের মতই ধরে আছেন। আমি তার পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছি... মাতলার ভিজে তীরে পড়ে যাচ্ছি.... আবার উঠে দৌড়াচ্ছি.... মায়ের কাছে পৌঁছাতে জানতে হয়।
সময় এগিয়ে চলে, রুপোলি পর্দায় তখন অন্য ছবি। আমার জামাই কিসে ভালো থাকবে.... কি পরবে.... কি খাবে.... কিসে কিসে ভালো থাকবে.... এর বাইরে তিনি কিছু ভাবতেই পারেন না। তিনিও মায়ের শিকড় ছড়ান। শিকড় বাড়তে থাকে......বাড়তেই থাকে মাটির গভীরে।
আমার শিশুডুরিকন্যা প্রচুর মিঠেকড়াদুষ্টু। ওর মা, অভিমানী শাসনের চেষ্টা করে। আমাকে বলে, - তুমি ওকে কিছু বলো না কেন! এভাবে আস্কারা পেয়ে যাবে।
কি বলবো!!!!! আমি তো তখন আমার ছেলেবেলা নিয়ে মেয়ের ভিতরে ঢুকে পড়ে দুষ্টুমি উপভোগ করছি। আর রং-তুলি নিয়ে মেয়ের মায়ের মুখে, আমার মাকে আঁকছি।
মেয়ে হঠাৎ হঠাৎ কোলে উঠে জড়িয়ে ধরে বলে, - আমাল বাবা... আমাল বাবা..... (সব মায়েরা হয়তো এআদুরে ভাষায় নিজের সন্তানকে আদর করেন) পরক্ষণই ছেড়ে দিয়ে টলমল পায়ে দৌড়ায় আর চেঁচায়, - বাবা, আমাল পিতনে পিতনে দৌলাও... আমাতে ধলো বাবা.......।
মেয়ের পিছন পিছন দুলকি চালে দৌড়াই।
কখনও দেখি, মা বাড়ির একের পর এক কাজ করার জন্য ছুটছে। আমি মায়ের পেছনে পেছনে ছুটছি..... পড়ে যাচ্ছি..... উঠছি.... আবার দৌড়াচ্ছি। মায়ের কাছে পৌঁছানো খুব দরকার।
_________________________________
মুক্ত গদ্যটি পড়ার জন্য অনেক শুভেচ্ছা ধন্যবাদ। সাথে থাকুন। পাশে থাকুন । ব্লগটিকে ফলো করুন। শেয়ার করুন। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

অসাধারণ
উত্তরমুছুন