সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৩

World Cup 2023, দুঃখ ভোলার রেমেডি


খেলা হবে
                                                                                         উৎপল 
World  Cup 2023, দুঃখ ভোলার রেমেডি
    World Cup 2023, দুঃখ ভোলার রেমেডি

     
            পাড়ার বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলতে নামলে আমার অবস্থা করুণ। কারণ, ব্যাট করতে গেলে দ্রুত গতির বল ঠিকঠাক দেখতে পাই না। সব বলে ঝাঁটা মার মানে সুইপ শট চালাই। ফলে ব্যাটে বলে হয় না। সুতরাং বন্ধুদের গালাগালি। আবার বল করতে গেলে বোলিং স্পিড কম হওয়ায়, ব্যাটাররা সব বল পাঠায় বাউন্ডারির পার। লে গালাগালি। তাই বেশিরভাগ সময়ই মাঠের বাইরে বসিয়ে রাখে। বল বয়।
           কিন্তু পাড়ার ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন গুমাদা আমাকে খুব ভালবাসে। অন্য পাড়ার সঙ্গে খেলা হলে কিম্বা দূরে কোনো টুর্নামেন্টে গুমাদা আমাকে নিয়ে যায়। তবে প্লেয়ার লিস্টের বারো তেরো নম্বরে নাম থাকে। তাই প্লেয়ার হিসাবে মাঠে নামতে হয় না। তবে ব্যাটটা, জলের বোতলটা এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার । হয়তো এজন্য গুমাদা আমাকে একটু বেশি ভালবাসে। সেদিন খেলার মাঠের কাছেপিঠে স্পাইসি খাবারের আয়োজন থাকে। জিভে দয়া জমে ওঠে।
          খেলা শেষে বাড়ি ফেরার রাস্তায় গুমাদা বলতে বলতে আসে,''মিলু আমি তোকে একটা টুর্নামেন্টে নামাবোই। তুই আনাড়ির মতো ব্যাট চালাবি না। বলের মুভমেন্ট দেখে ব্যাট করবি। আবার দ্যাখ, বল করার সময় বেশি গতির দরকার নেই। তুই স্লো বল করিস তো কি হয়েছে ? স্পিনবল করতে পারিস। অনিল কুম্বলেকে দ্যাখিস নি ডান হাতের পাক দিয়ে ঘুরানো বল, বাম  হাতে নিয়ে উঁচুতে তুলতে থাকে। তারপর কয়েকটা স্টেপে এগিয়ে গিয়ে ডান হাতের মোচোড় কি অসাধারণ লেগব্রেক। তাছাড়া আমাদের এই এলাকায় কোনো লেগস্পিনার নেই, ট্রাই করতে পারিস।"
                লাইট সবুজ রঙের একটা ভিকি বল কিনেছি। বাড়ির কাছে কিছুটা নেটজালের বক্সের মতো বানিয়ে তার মধ্যে ইউক্যালিপটাসের ডালের উইকেট পুঁতে, চলছে একা একা অনিল কুম্বলের বোলিং অ্যাকশনের অনুকরণে নেট প্রাকটিস। আর আমগাছের ডালে দড়ি বেঁধে বল ঝুলিয়ে চলছে ব্যাটিং মহড়া।
                একদিন গুমাদা ডেকে বলল, দশ বারো কিলোমিটার দূরে মুন্সিপুরে দুদিন ব্যাপী বিরাট ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আছে, আমি যেন কাল সকালে রেডি থাকি। 
             আমাদের টিম ফার্স্ট কোয়ার্টার ভালো ভাবেই উতরে গেল। পরদিন দুপুরের আগেই দুর্দান্ত সেমিফাইনাল খেলে ফাইনালে উঠলো। বিকাল তিন ঘটিকায় ফাইনাল ম্যাচ। ম্যাচ শুরুর ঘন্টা খানেক আগে হন্তদন্ত হয়ে গুমাদা এসে বলল, ''মিলু, রেডি হ। আজ তোকে মাঠে নামতে হবে। "শুনে তো আমি আকাশ থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম! কি হয়েছে গুমাদা? গুমাদা গজগজ করে...
                       অলরাউন্ডার রামাইদা আর তিন চারটে প্লেয়ার বিটন, জগা ও রাখু সেমিফাইনাল জয়ের আনন্দে লাঞ্চ ব্রেকের পরে বোতল সাটিয়ে কুপোকাত। ডাক্তার ডাকতে হয়েছে। রামাইদাকে ছাড়া ম্যাচ চলবে কি করে ! ও প্রতিটা ম্যাচে দারুণ খেলেছে। ওইই হয়তো ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট ! 
             মাইকে এগারোতম প্লেয়ার হিসাবে আমার নাম অ্যানাউন্স করল। বুকের ভিতর ১৫ই আগস্টের কুজকাওয়াজের ড্রাম বেজে উঠল। সঙ্গে বারবার হিসু। ইতিমধ্যে হোমিওপ্যাথি ওষুধের মতো প্যান্টে কয়েক ফোঁটা পড়েছে। টসে হার হল। আমাদের ফিল্ডিং।    
             মাঠের মাটি মাথায় কপালে ল্যাপ্টে  নামলাম। কাঁচুমাচু করে বললাম, ''গুমাদা বল কম যায়, এমন জায়গায় আমাকে ফিল্ডিং দাও।" গুমাদা হেসে বলে,"আজ তোর দিন রে মিলু, তুই যা পারিস কর।"
             প্রথম ওভারের তিন নম্বর বল। ব্যাটার লং লেগে মারল। এখানে আমি বাউন্ডারি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। বলটা গড়িয়ে দ্রুত গতিতে আসছে। যাহ্, কাছে এসে বলটা এমন একটা এবড়ো খেবড়ো জায়গায় ড্রপ পড়ল যে, আমার ঝাঁপিয়ে পড়া শরীরটাকে ফাঁকি দিয়ে বল বাউন্ডারি ছুঁলো। উঠে জামা প্যান্টের ধুলো ঝাড়তে শুনতে পেলাম দর্শকদের কথা, ''এইসব কইমাছ শোলমাছ ধরা মাউড়াফোট ফিল্ডার কোথা থেকে ধরে আনে ! বাওড়া প্লেয়ার।"
          ধারাভাষ্যকার মাইকে বলছে, ''এই চার রানের সুবাদে সবুজ সঙ্ঘ খাতা খুলল। আউট ফিল্ড একটু খারাপ আছে। কিন্তু এরকম ফিল্ডিং কাম্য নয়। এর মূল্য দিতে হতে পারে ফিল্ডিং করা দলকে।"
          এরপর পরই শুরু হল ব্যাটিং তান্ডব। প্রতি ওভারে চার ছক্কার ফুলঝুরি চলছে। সপ্তম ওভারের প্রথম বল। ব্যাটার সজোরে মেরেছে, বল শূন্যে কালো বিন্দুর মতো হয়ে আমার মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। ডান হাতটা উঁচু করে সর্ব শক্তি দিয়ে লাফ দিলাম। হাতের চার আঙুলে একটা কিছু সজোরে লাগলো। লাফের গতি সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেছি। 
               কয়েক সেকেন্ডের অবচেতন অবস্থা কাটিয়ে উঠে শুনছি দর্শকেরা বলাবলি করছে, ''বলটা ধরল, মাইরি। ভাবতে পারিস, নির্ঘাত ছক্কা ছিলো।" মেয়েদের হাসি মিশ্রিত কথা শুনতে পাচ্ছি,"দাদা আমাদের ফিল্ডিং করা শেখাবে।" পলকখানি ঘুরে তাকাতেই মেয়েদের একটা জটলা থেকে জোরালো হাসি এবং হাত নেড়ে উৎসাহ। 
            ওদিকে ধারাভাষ্যকারের গলা, ''জার্সি নম্বর সতেরো। যেভাবে শরীরটাকে পাখির মতো বাতাসে ভাসিয়ে অতো উঁচুর বল এক হাতে মুঠোবন্দি করেছে, তার তুলনা করা যায় একমাত্র জন্টি রোডসের সঙ্গে। এমন প্রতিভা গ্রামে থাকার জন্য মূল্য পায় না।"
            টিমের সবাই আমাকে ঘিরে ধরেছে। খেয়াল করলাম আমার ডান হাতের চার আঙুলের চক্রবূহে তখনও বলটা সেঁটে আছে। গুমাদার গলায় উৎসাহ আবেগ টগবগিয়ে ফুটছে। 
           নতুন ব্যাটার এলো। আবার শুরু হলো; চার ছক্কার বন্যা। ওরা নয় ওভারে পাঁচ উইকেটে একশ পঁয়ত্রিশ রান করেছে। গুমাদা অস্থির। প্রায় সবাইকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বল করাচ্ছে। দশ নম্বর ওভারের বলটা আমার হাতে তুলে দিল। পিঠে জোরালো থাপ্পড় কষালো.. "যাহ্ মিলু কয়েকটা উইকেট তুলে নে তো।"
      ফেব্রুয়ারির হাল্কা শীতেও আমার হাতের তালুর ঘামে বল ভিজে যাচ্ছে। মাঠের ধুলো মুঠোয় পুরে বল ধরি। পা কি মাটিতে আছে ! এটা তো বাড়ির প্রাকটিসের উঠোন নয়। আমি কি বল করতে পারি ! মাথা কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে শরীরের বিভিন্ন জংশনে ঢুকছে। সব দ্বিধাদ্বন্দ কাটিয়ে বোলিং লাইন আপে এলাম। গুমাদার কোনো পরামর্শ আর আমার কানে ঢুকছে না।  
       আম্পায়ারের কাছে টুপি রেখে, রাউন্ড দ্য উইকেট বল করতে গেলাম। প্রথম বল ভালোই স্পিন করেছে। ডানহাতি ব্যাটার ব্যাটে বলে করতে পারিনি। লেগ বাই হয়েছে। দ্বিতীয় বল ব্যাটারকে সম্পূর্ণ পরাস্থ করে নিখুঁত নিশানায় স্ট্যাম্প ভেঙে দিয়েছে। বোল্ড।    
        চারপাশ থেকে চিৎকার উল্লাস শুনতে পাচ্ছি। সেই মেয়েদের একজন লাল ওড়না ওড়াচ্ছে। 
         টিমের সবাই এসে জড়িয়ে ধরলো। মাথার চুলে হাত ঢুকিয়ে এলোমেলো করে দিচ্ছে। আর এরমধ্যে পিঠে পড়ল গুমাদার হাই ভোল্টেজ থাপ্পড়। পাঁচ আঙুলের প্রিন্ট মর্মে ও পিঠে অনুভব করতে পারছি। 
        কিন্তু আমার চোখের সামনে তখন শুধু তিনটে উইকেট। একটাই টার্গেট। পরের দুই বলে সিঙ্গেল রান। পঞ্চম বলে কট বিহাইন্ড। শেষ বলে এলবিডাব্লিউর জোরালো আবেদন আম্পায়ার নাকচ করে দিলেন। গুমাদা বার বার আফসোস করছে, "তোকে আরও আগে বল দিলে ভালো হতো রে মিলা।" 
                শেষ ওভার মানে, বারোতম ওভারে আরও তিন উইকেট নিয়ে কফিনে শেষ পেরেক পোঁতা হল। 
               মাইকের ধারাবিবরণিতে ঘুরে ফিরে আসছে,''গুমা একদশ দলের সতেরো নম্বর জার্সি মিলু হালদার পাঁচ উইকেট নিয়ে অসাধারণ বোলিং নৈপূর্ণ দেখালো।"
               জয়ের জন্য  লক্ষ্যমাত্রা, বারো ওভারে একশ সাত চল্লিশ রান। 

            ব্রেক টাইমে একটা চিরকুট পেলাম। " "দর্শক হিসেবে তোমার খেলার ভাগীদার হতে পেরে ভাল লাগছে। তোমার জয়েরও অংশীদার হতে চাই। ইতি, লাল ওড়না।" 
                    গুমাদা ওপেন নেমে ফাটাফাটি ব্যাটিং করছে। নিজের নামের প্রতি সুবিচার করা যাকে বলে। কারণ, গুমাদার আসল নাম 'গুনময় রায়'। কিন্তু আমাদের নন স্টাইকের ব্যাটাররা যে ঝরা পাতার গান শোনাচ্ছে। স্থায়ী পার্টনারশিপ হচ্ছে না। তবে অনেকেই কম বলে বেশি রান করে আউট হয়েছে। 
             এক সময় দেখি, শেষ ওভারে দরকার সাত রান। আর হাতে আছে উইকেট বলতে 'আমি' ! এখনও গুমাদা ক্রিজে আছে, নির্ঘাত জিতে যাব। আনন্দ উত্তেজনার চোরা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। 
                শেষ ওভারের প্রথম বল, গুমাদা প্লে ডাউন! হায় রে! 
                ব্যাট না, যেন ভীমের ভারি গদা নিয়ে ক্রিজের দিকে চলেছি। পথে গুমাদা ব্যাটে ব্যাট ঠুকে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,''এই বোলার একটু অফের বাইরের দিকে বল করে। পারলে বলের দিকে বাঁ পা বাড়িয়ে আলতো করে ঠুকে দিস। তোর ব্যাটেই জিৎ।"
              ব্যাট হাতে রেডি। বোলার বোলিং করল। সত্যি সত্যি অফ স্ট্যাম্পে কিছুটা বাইরে দিয়ে দ্রুত গতিতে বল উইকেট কিপারের বিশ্বস্ত দস্তানায়। পরের বল একই রকম। গুমাদার বুদ্ধি অ্যাপ্লাই করলাম। অফের দিকে পা বাড়িয়ে হাল্কা টার্চ। বল ব্যাট ছুঁয়ে, স্লিপ দিয়ে চার।    
           কিন্তু এরপর স্লিপে এবং ব্যাটের কাছাকাছি ফিল্ডার দাঁড় করালো। তার উপর বল ইনসুইং করে মিডিলস্ট্যাম্পে আসছে। এখন কোনো রকমে ডিফেন্স করে যাচ্ছি। সিঙ্গেল রান নেওয়ারও উপায় নেই। শেষ বল ইয়র্কার, যা আছে কপালে ভেবে, প্রায় চোখ বুজে দড়াম করে ব্যাট চালিয়েছি, বল ডীপ কভার পয়েন্ট দিয়ে মাটি কামড়ে সীমানার বাইরে। 
             আমি হয়তো মেঘের উপর থেকে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে দেখছি। আমার ব্যাটে উইনিং শট। এবং সত্যি সত্যি আমি শূন্যে... আর শূন্যে উড়ছে একটা লাল উড়না। ম্যাচ জয়ের আনন্দের রং উড়ছে। 
            টিমের সবাই ছুটে এসে একযোগে আমাকে ধরে উপরের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। আবার ক্যাচ ধরার মতো লুফে নিচ্ছে। আর সঙ্গে চিল চিৎকার। আর এরমধ্যেই চলছে সেই হাতের হাই ভোল্টেজ থাপ্পড়। 
        
             আবার চিরকুট পেলাম হাতের মুঠোয়। "আর কদিন পর সরস্বতী পুজো। সেদিন আমাদের গ্রামে এসো। একসাথে পুষ্প অঞ্জলি দেব। মাঠের সম্পর্ক বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই।" আরেকটা চিরকুটে লেখা, "অটোগ্রাফ প্লিজ..." 

         ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কার নিতে উঠলাম। মাইক্রোফোনে দু একটা কথা বলার জন্য জোর করলো। অভাবনীয় জয়ের আনন্দে আমি কথা বলার অবস্থায় নেই। শুধু বললাম, "এখানেই শেষ নয়, খেলা হবে।" 
        সবাই ঘন হাততালি দিল এবং থেমে গেল। কিন্তু একটা হাততালি তখনও থামেনি। 
      পৃথিবীর প্রত্যেক গ্যালারিতে ওই হাততালি শোনার অপেক্ষায় থাকব সবাই। 
_______________________________________________________
 
রম্যরচনাটি পড়ার জন্য অনেক শুভেচ্ছা ধন্যবাদ। সাথে থাকুন। পাশে থাকুন । ব্লগটিকে ফলো করুন। শেয়ার করুন। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন