ব-এ বই
ফ-এ ফুচকা ক্যাফে
বাড়ি থেকে বেরলেই মাথা নিচু করে চলি।
আবার নিচু মাথাতেই বাড়ি ফিরে আসি।
এভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছি,
হাজার প্রশ্ন
তুচ্ছ তাচ্ছিল্য
অবহেলা
নিন্দা
একপেশে করে দেওয়ার
নগ্ন বাতাস।
পাড়ার সমীর জেঠু, দেখা হলেই প্রশ্ন দিয়ে আমাকে শিকার করেন।
"কি রে! এম এ তো পাশ করলি ক'বছর হল! কি করছিস টরছিস?"
এ সহজ প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে।
প্রলয় রায় বাবুর সঙ্গে কিভাবে যে রাস্তায় মুখোমুখি দেখা হয়ে যায়!
"তোমরা ইউনিভার্সিটি পাশ করে বসে আছো, তোমাদের দেখে ভয় হয়, আমার ছেলেমেয়েরা স্কুলকলেজে পড়ছে, কি যে হবেঃ---"
ক্লাস এইটে পড়া লতিকার বাবা,
খ্যা খ্যা করে হাসেন, "এত্তো পড়াশুনো করে কিনা পেরাইমারির ফরোম ফিলাপ করিস, আমার ছাবাল মাইয়ে ওরম নিচু তলার মাস্টারি চাকরি করবেনে, বুইলি।"
আমি পালিয়ে বাঁচি। প্রাইমারি ফর্ম ফিলাপ করা
বোধ হয় উচিত হয়নি!
এইরে!
এলাকায় সঘোষিত নামি টিউটরের
সামনে এসে পড়লাম!
এইবার শুরু হল--
"তোকে তখনই বলেছিলাম, বাংলা টাংলা নিয়ে পড়িস না, বাংলা পড়ে হাজারটা ছেলে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে, ইংলিশ কিম্বা জিওগ্রাফি অনার্স নিতিস; এ অবস্থায় থাকতে হতো না। আমার ছাত্রছাত্রীরা কত বড়ো বড়ো পদে চাকরি করে, জানিস। এইতো দুদিন আগে এক ছাত্রী প্রণাম করে মিষ্টি দিয়ে গেল, সরকারি উঁচু পরীক্ষায় ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট চাকরি পেয়েছে। চোখ কান খোলা রেখে চল, অনেক সময় অপব্যয় করেছিস।"
জ্ঞান
তত্ত্ব
তথ্যের আঘাত,
আমাকে
থ্যাথলাচ্ছে
পিষছে।
শিক্ষিত অথচ বেকার থাকা, অপরাধ!
" এখন কি করছিস? "
এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতেই পারছি না।
এ প্রশ্নের ভয়ে আত্মীয় বাড়ি যাই না।
আত্মীয় বাড়ির অনুষ্ঠান বয়কট করেছি।
এক বান্ধবীর গায়ে পড়া অনুরোধে,
তার বিয়েতে উপস্থিত হতেই হল।
সেখানে আরও বান্ধবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ;
ওদের—
বয়ফ্রেন্ড
বরফ্রেন্ড
হাফফ্রেন্ড
হ্যাজব্যান্ড
সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
তারা,
ব্যাঙ্গালুরুর ইঞ্জিনিয়ার ,
কলকাতার এমবিবিএস
স্টাটাপ বিজনেস ম্যান
আর, নিলিমার মনের মানুষ যে
সিরিয়ালের অভিনেতা!
তিনিই বিয়ে বাড়ির আসল ক্রাশ।
উনি ফ্যান ফলোয়ারে মেতে আছেন,
সেলফি উঠছে খচখচ শব্দে।
ওদেরকে আমার পরিচয় দিতে পারি নি।
বলতে গিয়ে শুধু, "আআআমি আআমি--"
করতে করতে গ্যাঁ গ্যাঁ ম্যাঁ ম্যাঁ করে গেছি।
সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা রোজগারে
টিউটর তোতলামি তো করবেই।
কোনের দিকের খাবার টেবিলে বসলাম।
সুস্বাদু খাবার। কিন্তু খেতে পারছি কই?
মাংসের পিস গুলো যেন 'গদা',
আলু গুলো 'ফুটবল' হয়ে গেছে!
ওরা আমার সরু হয়ে থাকা খাদ্যনালী দিয়ে নামবে না।
এই
আলো
এই
আনন্দ
এই
আভিজাত্য
এই
আয়োজন,
এখানে আমি বেমানান।
এখান থেকে আমাকে পালাতে হবে।
প্রেমিকাদের খাতায় আমার নাম নেই।
পাত্রীর বাবারা আমার নাম কেটে দিয়েছে।
বেকাররা;
কারও
প্রেমিক
বর
বন্ধু
আত্মীয়
হতে পারে না।
আমাকে পালাতে হবেই।
রাস্তায় নেমে দৌড়াচ্ছি। রাত বাড়ছে।
স্ট্রিট লাইট নিভু হয়ে আসছে।
দৌড় আর দৌড়...
রাত প্রহরী কুকুর তাড়া করছে।
দৌড় দৌড় দৌড়...
নিজের ছায়াও তাড়া করছে।
দৌড় শুধুই দৌড়...
অলিগলির হাজার শর্টকাট দিয়ে চলেছি।
কে একজন মোড়ের মাথায় জাপটে ধরল!
বলল, 'কোথায় পালাছিস' ?
দেখি, হারুকাকা। ফুচকাওয়ালা।
"কড়া লঙ্কা দে ফুচকা দিচ্চি, পেট পুরে খা, দেখবি সব ভয় কেটে জা়বেন।"
ফুচকার জন্য হাত ও গাল পেতে দাঁড়াই।
হারুকাকা ফুচকা খাওয়াতে খাওয়াতে
বলে, "এই ঝুরঝুরে টকঝাল ব্যবছা আমারে দকিণ পূরবো কলকাতায় এচতায়ী ঠিকানার বারি দেচে,
মাদ্যমিক ফেল চেলের দশ লাখ টাকার
মিনারেল জলের ব্যবছা হয়েছ্,
শোন; আমার পাশে তুই ক'দিন দাঁরা, রোজগাররে বুরো আঙুলি ভাঙ্।
হারুকাকার পাশে রোজ দাঁড়াই
দেখি, সব হাঁ মুখে শহর ঢুকছে;
ক্লান্ত হাতে থাকছে শূন্য টক জলের বাটি।
বেশ কাজ।
সহজে অন্যের মুখ বন্ধ রেখে
রোজগার করা যায়।
সাহস পাচ্ছি।
কাজে নেমে পড়া দরকার।
তবে কিছু বাধা সরাতে হবে।
অবশেষে,
নিজের ডেডবডিকে ফেলে এলাম
কেষ্টপুর খালের পাড়ে।
ডিগ্রি ডিপ্লোমার বাতিল কাগজগুলোকে,
প্লেন,
ফুল,
লতা পাতার নক্সা
বানিয়ে ছড়িয়ে এসেছি লাশের উপর।
এবার ঠেলা নিয়ে ফুচকার ফেরি করে
ফিরি –
বাগুইআটি
বেলঘরিয়া
বাগবাজার
বেলেঘাটা
বাইপাস
কখনও,
বারুইপুর মেলায়।
কয়েক বছরে পকেটে জমে উঠেছে
অসংখ্য –
দশ
কুড়ি
পঞ্চাশ
একশোর
দুশোর
গান্ধীবাদী নোট।
এগুলো দিয়ে,
শহরের এক প্রান্তে চিলতে জমি কিনেছি।
গড়েছি ফুড কোর্ট।
এখানে বই ও ফুচকার স্বাদ...
ভা
গা
ভা
গি
হয়।
একপাশে ফুচকার স্টল।
অন্য পাশগুলো সাজানো,
নতুন সময়ের লেখক লেখিকাদের
বাংলা বাংলা বই।
আসুন - পড়ুন - পড়ান
এবং
সমালোচনা লিখুন,
দোকানের ওয়েবসাইটে।
আর
পেয়ে যান,
ফুচকার প্লেটে স্পেশাল ডিসকাউন্ট ।
এখন মাথা উঁচু করে
ফুচকা বেচি
বই পড়ি
বই লিখি
রোজগার করি।
দোকানের নাম?
ব-এ বই
ফ-এ ফুচকা ক্যাফে
____________________________________________
কবিতাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।


Ata to tomar kache age porechi
উত্তরমুছুনফেসবুক এ ছিল।
মুছুনhttps://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1913682568784606&id=100004286435981