ব্যাঙ্ক
উৎপল মণ্ডল
একটা ছোটখাটো বেসরকারি অফিসে চাকরি পেয়েছি। বস খুব কড়া, আফিসে ঢুকতে পাঁচ মিনিট লেট হলেই খ্যাঁক খ্যাঁক। কিন্তু আজ অফিসে যাওয়ার আগে পাঞ্জাব ব্যাঙ্কে (Punjab National Bank) যাওয়া দরকার । একটা সরকারী চাকরীর পরীক্ষার ডিমান্ড ড্রাফট কাটতে হবে। বসকে ফোন করেছি; বস জানালো, এক ঘন্টার বেশি সময় যেন না লাগে।
ব্যাঙ্কে যাব বলে রাস্তায় বেরিয়ে কিছুটা যেতেই একজন হন্তদন্ত হয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, দাদা এসবিআই ব্যাঙ্কটা কোন দিকে পড়বে। আমি বলি, SBI এর ফুল ফর্ম State Bank of India আপনার শেষের ব্যাঙ্কটা বলার দরকার নেই। উনি চটে ওঠেন, আগে ব্যাঙ্ক টা কোথায় বলুন তো, অ্যামাজনের ডেলিভারি বয় আমার অর্ডার করা নতুন মোবাইল এনে এসবিআই ব্যাঙ্কের সামনে আধ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে। আসলে আমাদের পশ্চিম পাড়ার রাস্তার কাজ হচ্ছে। তাই কোনো গাড়ি টাড়ি ঢুকতে পারছে না।
আমি পাঞ্জাব ব্যাঙ্কে গিয়ে পাব্লিক বসার লম্বা কাঠের বেঞ্চে বসে ফর্ম পুরোন করেছি। এক বয়স্ক লোক এসে বললেন, বাবু কলমটা একটু দেবেন। আমি বলি, দেখুন না কাউন্টারের ওদিকে পেন দড়ি দিয়ে বাঁধা আছে। উনি হেসে মাথা নেড়ে উত্তর দেন, কলম বাঁধা আছে ঠিকই কিন্তু কলমের রিফিল কেউ খুলে নিয়ে গেছে। তাই দয়া করে যদি...
আবার একজন এলো একরাশ ব্যস্ততা নিয়ে, দাদা তাড়াতাড়ি আমার টাকা তোলার উইথ ড্রল ফর্মটা লিখে দিন না। আমি মুচকি হেসে বলি, উইথ ড্রল ফর্ম বলেই হয়। টাকা তোলার বলার দরকার নেই। আপনার কথার ধরন শুনে মনে হয়, আপনার ভাই এসবিআই ব্যাঙ্কের সামনে মোবাইল ডেলিভারি নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। উনি কথাটা লুফে নিলেন, হ্যাঁ ওটাই আমার ভাই। ওই হতোচ্ছাড়াটার জন্যেই ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে আসা। মোবাইল ডেলিভারি নিতে গেছে, এদিকে পকেটে টাকা নেই।
প্রায় এক ঘণ্টা হতে চলল, আমি ব্যাঙ্ক থেকে বেরোতে পারছি না। এর টাকা জমা দেওয়ার ফর্ম, ওর টাকা তোলার ফর্ম , কারও আবার চেক লিখে দিতে হচ্ছে। সবাই পাঁচ দশ টাকা করে দিতে চাইছিল। টাকা নিই নি, নইলে ততখনে একশো টাকার বেশি হয়ে যেত। কেউ কেউ বলল, ব্যাঙ্কের লোকেরা ইচ্ছা করে ইংরেজীতে লেখা জটিল ফর্ম তৈরি করে যাতে ব্যাঙ্কের বাইরে টেবিল নিয়ে বসে থাকা কিছু লোক দু পয়সা রোজগার করতে পারে।
ব্যাস, এবার একটু ফাঁকা হয়েছে অফিসের দিকে পা বাড়াই। যা লেট হওয়ার হয়ে গেছে। আজ কপালে - কানে বসে বসের ধাতানি আছে। উঠতে যাব,
একটা মিষ্টি কন্ঠের অনুরোধ , দাদা ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলার এই ফর্মটা লিখে দেবেন। খুব আর্জেন্ট।
চোখ তুলে তাকাতেই কন্ঠস্বরের মতোই অসাধারণ সুন্দরী ফর্ম বাড়িয়ে ধরে আছেন। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে তার কাছ থেকে ফর্মটা নিয়ে তার দিকে কৌতুহলি চোখে তাকালাম।
সে বলল, ব্যাঙ্কের লিফ্টে উঠতে একজন এমন ধাক্কা মেরেছে যে লিফ্টের দরজার ফাঁকে ডান হাতের তিনটে আঙুল ঢুকে ইনজিওড হয়েছে । নিচে নেমে দোকান থেকে বরফ দিয়ে এসেছি। লিখতে পারছি নাহ্, এই দেখুন অবস্থা..... ভিসার জন্য এই অ্যাকাউন্টটা খোলার খুব দরকার। বাবা সঙ্গে আসতো কিন্তু অফিসে দরকারী কাজ আছে বলে আসেনি। বাবার ছোটো অফিস। তার উপর একজন কর্মচারী আজ লেট করে অফিসে আসবে।
দেখলাম মোমের মতো ডান হাত। হাতের তর্জনি মধ্যমা অনামিকা তিন আঙুল ফুলে গেছে। বললাম, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড,মোবাইল নম্বর, পাসপোর্ট ফোটো দিন ফর্ম ফিলাপ করে দিচ্ছি ।
সে মোলায়েম ভাবে থ্যাঙ্কস জানালো। তার ফোনে কল এলো। আমাকে সরি বলে, একটু দূরে গিয়ে কল রিসিভ করল।
ব্যাঙ্ক থেকে অফিসে ঢুকতে দুটো বাজলো। বস তলব করেছে, ঢিপঢিপ বুক নিয়ে বসের রুমে ঢুকলাম। বসের ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। একটা বিরিয়ানি পার্সেল আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, অনুময় এটা তোমার গিফট। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমার মুখ এতোটাই ফাঁক হয়ে গেছে যে বিরিয়ানির মধ্যে থাকা বোম আলু স্বচ্ছন্দে ঢুকতে পারে।
বস আমার অবস্থা অনুমান করে বলল, ব্যাঙ্কে যার অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ফর্ম ফিলাপ করে দিয়েছো, সে আমার মেয়ে সুনয়া পাল। ও ব্যাঙ্কে থাকাকালীন আমি ফোন ওকে করি। সব কিছু জানায় এবং যে হেল্প করছে তার ছবি what'sapp এ পাঠায়। আমি ছবি দেখে তোমাকে চিনতে পারি। থ্যাঙ্ক ইউ।
আমি ভাবলাম, এই জন্য ফর্মে ফাদার্স নেম লেখার সময় নামটা চেনা চেনা লাগছিল।
পুনশ্চ : সুনয়া কল করে বলল, ছিঃ ছিঃ আমি সদ্য এমাসে ব্যাঙ্কে চাকরি পেলাম। আর তুই আমাকে তোর লেখায় একটা ক্যারেক্টার বানিয়ে ঢুকিয়ে দিলি। কুত্তা একটা। আবার নিজের নাম পাল্টে অনুময় রাখা হয়েছে ! দাঁড়া দেখা হোক তোকে পেঁদিয় পিজ্জা বানাবো।
আমি বলতে থাকি, - হ্যালো হ্যালো সুনয়া, কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না... সাউন্ড ড্রপ করছে, পরে কথা হবে এএএএ....
_________________________________________



Khub chalo legeche
উত্তরমুছুনভালো হবে
মুছুন